মানবতার অন্ধকার থেকে আলোর পথে মহানবীর আবির্ভাব

কামরুল ইসলাম

ইতিহাসে কিছু মানুষ আসেন, যাঁদের জীবন শুধু একটি জাতি, একটি ভূখণ্ড কিংবা একটি নির্দিষ্ট সময়কে পরিবর্তন করে না তাঁদের প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে, দেশ থেকে দেশে, মানুষের হৃদয় থেকে মানুষের হৃদয়ে। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) তেমনই একজন মহামানব। মুসলমানদের বিশ্বাস অনুযায়ী, তিনি আল্লাহর সর্বশেষ নবী ও রাসুল এবং তাঁর মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা মানবজাতির জন্য পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থার পথনির্দেশ দিয়েছেন। তাই প্রশ্ন উঠতে পারে হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ না করলে মানবসভ্যতার চিত্র কেমন হতে পারত? এর নির্দিষ্ট উত্তর মানুষের পক্ষে জানা সম্ভব নয়। কারণ আল্লাহর পরিকল্পনা ও অদৃশ্য জগতের বাস্তবতা মানুষের জ্ঞানের বাইরে। তবে কোরআন ও সহিহ হাদিসে তাঁর আগমনের উদ্দেশ্য, তাঁর চরিত্র এবং তাঁর মাধ্যমে সংঘটিত পরিবর্তনের দিকে তাকালে আমরা বুঝতে পারি, তাঁর আগমন মানব ইতিহাসে কত গভীর তাৎপর্য বহন করে।

অন্ধকারের মধ্যে আলোর আবির্ভাব-

পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন “আমি আপনাকে বিশ্বজগতের জন্য রহমত স্বরূপই প্রেরণ করেছি।” সূরা আল-আম্বিয়া, ২১:১০৭

এই একটি আয়াতই মহানবী (সাঃ)-এর আগমনের ব্যাপ্তি বোঝার জন্য যথেষ্ট। তিনি শুধু আরবদের জন্য নন, শুধু মুসলমানদের জন্য নন কোরআনের ভাষায় তিনি ‘বিশ্বজগতের জন্য রহমত’।

তাঁর আগমনের পূর্বে আরব সমাজে গোত্রীয় সংঘাত, অন্যায়, দুর্বলদের ওপর অত্যাচার, নারীর প্রতি অবমাননা, কন্যাশিশুকে জীবন্ত কবর দেওয়ার মতো নিষ্ঠুরতা এবং মূর্তিপূজার ব্যাপক প্রচলন ছিল। অবশ্য পৃথিবীর অন্য অঞ্চলেও তখন নানা সভ্যতা ও ধর্মীয়-নৈতিক ঐতিহ্য বিদ্যমান ছিল। তাই বলা ঠিক হবে না যে, পুরো পৃথিবীই একেবারে অন্ধকারে নিমজ্জিত ছিল। কিন্তু আরব উপদ্বীপের সামাজিক বাস্তবতায় গভীর নৈতিক সংকট ছিল।

সেই সমাজে এসে মহানবী (সাঃ) ঘোষণা করলেন মানুষের মর্যাদা বংশ, গোত্র, সম্পদ কিংবা ক্ষমতায় নয়; মানুষের প্রকৃত মর্যাদা আল্লাহভীতি ও নৈতিকতায়।

মানুষকে মানুষ হিসেবে মর্যাদা –

মহানবী (সাঃ)-এর শিক্ষা মানুষের মর্যাদাকে নতুন উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত করে। কোরআনে আল্লাহ বলেন “হে মানুষ! আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি একজন পুরুষ ও একজন নারী থেকে এবং তোমাদের বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা পরস্পরের পরিচিত হতে পারো। নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে তোমাদের মধ্যে সে-ই অধিক মর্যাদাসম্পন্ন, যে অধিক তাকওয়াবান।” সূরা আল-হুজুরাত, ৪৯:১৩।

এই শিক্ষা মানুষের মধ্যে বংশগত অহংকার, জাতিগত শ্রেষ্ঠত্ব ও গোত্রীয় বিদ্বেষের পরিবর্তে নৈতিকতার ভিত্তিতে মর্যাদার ধারণা প্রতিষ্ঠা করে।

মহানবী (সা.)-এর বিদায় হজের ভাষণেও মানবসমতার গভীর শিক্ষা প্রতিফলিত হয়েছে। তিনি মানুষের জীবন, সম্পদ ও মর্যাদার নিরাপত্তার ওপর গুরুত্ব দেন এবং জাহেলি যুগের রক্তের প্রতিশোধ ও সুদপ্রথার অবসানের ঘোষণা দেন।

নারী ও দুর্বল মানুষের অধিকার –

মহানবী (সাঃ)-এর আগমনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ছিল নারী, এতিম, দরিদ্র ও দুর্বল মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা। কোরআনে এতিমের সম্পদ অন্যায়ভাবে আত্মসাৎ করতে নিষেধ করা হয়েছে। নারীদের সম্পত্তির অধিকারও সুস্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কোরআন ঘোষণা করেছে-

“পুরুষদের জন্য রয়েছে পিতা-মাতা ও আত্মীয়স্বজনের রেখে যাওয়া সম্পদের অংশ এবং নারীদের জন্যও রয়েছে পিতা-মাতা ও আত্মীয়স্বজনের রেখে যাওয়া সম্পদের অংশ।” সূরা আন-নিসা, ৪:৭

অর্থাৎ নারীও উত্তরাধিকারের অধিকারী যা তৎকালীন বহু সমাজের প্রচলিত বাস্তবতার তুলনায় গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তন।

প্রতিশোধের পরিবর্তে ক্ষমা-

মহানবী (সা.)-এর চরিত্রের সবচেয়ে উজ্জ্বল দিকগুলোর একটি ছিল ক্ষমা ও দয়া। কোরআনে তাঁর চরিত্র সম্পর্কে আল্লাহ বলেন- “নিশ্চয়ই আপনি মহান চরিত্রের অধিকারী।” সূরা আল-কলম, ৬৮:৪

তিনি ব্যক্তিগত অপমানের প্রতিশোধকে জীবনের আদর্শ বানাননি। বরং ক্ষমা, সহনশীলতা ও দয়ার শিক্ষা দিয়েছেন। সহিহ মুসলিমে তাঁর একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাণী এসেছে- “যে মানুষের প্রতি দয়া করে না, আল্লাহ তার প্রতি দয়া করেন না।” সহিহ মুসলিম, ২৩১৯

এ শিক্ষা শুধু মুসলমানের প্রতি নয় মানুষের প্রতি দয়া, সহমর্মিতা ও মানবিকতার শিক্ষা।

যদি তিনি না আসতেন?

এখানে আমাদের খুব সতর্ক হতে হবে। আমরা নিশ্চিতভাবে বলতে পারি না যে তিনি না এলে পৃথিবী অবশ্যই কী রূপ নিত। কারণ ইতিহাসের বিকল্প পথ আল্লাহই সবচেয়ে ভালো জানেন।

তবে ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায় মহানবী (সাঃ)-এর আগমন মানবতার জন্য যে শিক্ষা, নৈতিকতা, আধ্যাত্মিকতা ও সামাজিক সংস্কারের পথ উন্মুক্ত করেছিল, তাঁর অনুপস্থিতিতে সেই নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক পরিবর্তন ঘটত না। তাঁর মাধ্যমে মানুষ পেয়েছে

এক আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস, মানুষের মর্যাদার শিক্ষা, ন্যায়বিচারের আদর্শ,

দুর্বলদের অধিকার, নারীর মর্যাদা, এতিমের অধিকার, দয়া ও ক্ষমার শিক্ষা, জ্ঞানার্জনের প্রেরণা এবং আখিরাতের জবাবদিহির চেতনা। এই কারণেই তাঁর আগমনকে শুধু একটি ঐতিহাসিক জন্ম হিসেবে দেখলে তাঁর মর্যাদার বিশালতাকে বোঝা যায় না।

তাঁর উম্মত ও পৃথিবীর প্রতি দায়িত্ব-

মহানবী (সাঃ)-এর আগমন শুধু প্রশংসা করার বিষয় নয়; তাঁর আদর্শ অনুসরণ করার বিষয়। কোরআনে বলা হয়েছে- “নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়বিচার, সৎকর্ম ও আত্মীয়স্বজনকে দান করার নির্দেশ দেন এবং অশ্লীলতা, অসৎকর্ম ও সীমালঙ্ঘন থেকে নিষেধ করেন।” সূরা আন-নাহল, ১৬:৯০

অতএব মহানবী (সা.)-কে ভালোবাসার প্রকৃত প্রমাণ হলো তাঁর চরিত্রকে জীবনে ধারণ করা মিথ্যার পরিবর্তে সত্য, অন্যায়ের পরিবর্তে ন্যায়, ঘৃণার পরিবর্তে দয়া, প্রতারণার পরিবর্তে আমানতদারি এবং হিংসার পরিবর্তে মানবিকতা।

সহিহ বুখারিতে মহানবী (সা.) তাঁর সময়ের প্রজন্ম এবং পরবর্তী দুই প্রজন্মের শ্রেষ্ঠত্বের কথা বলেছেন।থ সেই প্রথম প্রজন্মের মানুষদের পরিবর্তনই প্রমাণ করে একজন সত্যিকারের আদর্শ মানুষ কীভাবে একটি সমাজের চরিত্র বদলে দিতে পারেন।

মহানবী মুহাম্মদ (সাঃ)-এর জন্ম না হলে পৃথিবী ঠিক কেমন হতো প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর কেউথ দিতে পারি না। কারণ সেটি একটি অদৃশ্যথ অনুমান।

কিন্তু তাঁর জন্মের পর পৃথিবীতে যে পরিবর্তন ঘটেছে, তা ইতিহাসের বাস্তব ঘটনা। একজন শিশু মক্কার বুকে জন্ম নিলেন। তিনি বড় হলেন একজন সত্যবাদী মানুষ হিসেবে। তিনি নবুয়ত পেলেন। তিনি মানুষকে এক আল্লাহর দিকে ডাকলেন। তিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ালেন। তিনি দাস, দরিদ্র, এতিম ও দুর্বলদের মর্যাদা দিলেন। তিনি শত্রুর প্রতিও ক্ষমার দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন। আর তাঁর মাধ্যমে একটি নৈতিক ও আধ্যাত্মিক আন্দোলন বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ল।

তাই মুসলমানের হৃদয়ে তাঁর জন্মদিন শুধু আনন্দের স্মৃতি নয়; এটি মানবতার প্রতি দায়িত্ব স্মরণ করার দিন।

আমরা যদি সত্যিই মহানবী (সাঃ)-কে ভালোবাসি, তবে তাঁর নামে শুধু আবেগ প্রকাশ নয় তাঁর আদর্শে নিজেদের জীবন গড়তে হবে। কারণ কোরআনের ভাষায় তিনি ছিলেন “বিশ্বজগতের জন্য রহমত।” আর সেই রহমতের সবচেয়ে বড় দাবি হলো মানুষ যেন মানুষের মতো মানুষ হয়ে ওঠে। ইয়া রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা।

 

খুলনা গেজেট/এনএম




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন